সবুজ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগে আগ্রহী বিশ্বব্যাংক

৩০ অক্টোবর, ২০২৩ ১৭:০৯  

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি এড়াতে বাংলাদেশের বছরে সাড়ে ১২ বিলিয়ন বা ১ হাজার ২৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। এদিকে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের মতে, বিপুল অঙ্কের এ বিনিয়োগ সরকারের একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। গত কয়েক দশকে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি মানুষকে জলবায়ু সংকটের মুখে পড়তে হয়েছে। যারাই দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে তাদের নিজেদের উত্তরণের জন্য অনেক সময় নিতে হয়েছে। স্বল্প সময়ের উত্তরণের পর দীর্ঘ মেয়াদে স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। এ থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সবুজ প্রযুক্তি। বিশ্বব্যাংক এ প্রযুক্তিকে উৎসাহ দেয় এজন্য যে, এতে উচ্চ উৎপাদনশীলতা আসে।

সোমবার (৩০ অক্টোবর) রাজধানীর একটি হোটেলে বিশ্বব্যাংক ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) আয়োজিত ‘টুওয়ার্ড ফাস্টার, ক্লিনার গ্রোথ ইন সাউথ এশিয়া’ শীর্ষক কনফারেন্সে এসব আলোচনা হয়।

আলোচনায় বক্তারা বলেছেন, বৈশ্বিক জ্বালানী শক্তি রূপান্তরের সুযোগ ব্যবহার করে দক্ষিণ এশিয়ায় উৎপাদনশীলতা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যেতে পারে, বায়ু দূষণ হ্রাস করা যেতে পারে, এবং জ্বালানি আমদানির উপর নির্ভরতা কমানো যেতে পারে। অথচ এ সুযোগ নিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে যেসব কার্যক্রম নেওয়া প্রয়োজন, দক্ষিন এশিয়ার সরকারগুলোকে সে কাজগুলো সীমিত রাখতে হয় মন্থর হয়ে আসা প্রবৃদ্ধি এবং আর্থিক চ্যালেঞ্জের কারণে। কিন্তু আর্থিক বিনিয়োগের ক্ষমতা সীমিত থাকলেও এ বিষয়ে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলি বিভিন্ন কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে। যেমন সহায়ক বাজারনীতি, তথ্য প্রচার, অর্থায়নের সুবিধা এবং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুত ব্যবস্থা প্রণয়ন করার মাধ্যমে সরকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করতে পারে বিভিন্ন জ্বালানী রূপান্তর প্রযুক্তি যেমন, দক্ষ শক্তির প্রযুক্তি গ্রহণে ।

দীর্ঘদিন ধরে উচ্চমাত্রার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়া আজ ঝুঁকির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। আঞ্চলিক অর্থর্নৈতিক হাল নিয়ে করা বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ রিপোর্ট এমনটাই বলছে। মূলত বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সমাধান হিসাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানী শক্তির যে রূপান্তর চলছে এতে অংশগ্রহণ করে এ অঞ্চলে উচ্চ প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার ব্যাপক সম্ভাবনার প্রতিও এ রিপোর্ট আলোকপাত করেছে। এই রিপোর্টের প্রেক্ষাপটে গবেষক, নীতিনির্ধারক, ও উন্নয়নকর্মীদের জন্য এ অঞ্চলে সবুজ বৃদ্ধির বা, Green Growth-এর সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করবেন দুই দিনের সম্মেলনে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শক্তি দক্ষতার উন্নতি দক্ষিণ এশিয়ায় অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত, উভয় লক্ষ্যের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে পারে। প্রতি ইউনিট অর্থনৈতিক উৎপাদনের জন্য এই অঞ্চলে বৈশ্বিক গড় শক্তির দ্বিগুণ ব্যবহার হয়, যা পরিবেশে ও অর্থনীতির জন্য সমানভাবে ক্ষতিকর। যদিও দক্ষিণ এশিয়ার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো নানারকম প্রাথমিক পর্যায়ের শক্তি-দক্ষ প্রযুক্তি উৎসাহের সাথে গ্রহণ করেছে, আরও উন্নত ও নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে তার পিছিয়ে রয়েছে। প্রণোদনা পেলে তারা এক্ষেত্রে এগিয়ে যাবে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা মন্ত্রী এম.এ. মান্নান “সবুজ উন্নয়নে বাংলাদেশে অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে। যেমন, আমাদের পোশাকশিল্প কারখানাগুলো সারা বিশ্বের সবুজায়িত কারখানাগুলো মধ্যে সেরা” ।

মান্নান আরও বলেন, “বাংলাদেশের এনার্জি এফিশিয়েন্সি অ্যান্ড কনজারভেশান মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী দেখানো পথেই আমাদের চলতে হবে। এই পরিকল্পনায় বৃহৎ শিল্প ও জ্বালানী শক্তি ব্যবহারকারী, আবাসিক গ্রাহক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থা কিভাবে শক্তি-দক্ষতা অর্জন করতে পারে, তার উল্লেখ রয়েছে।”

হাওর ও পাহাড় অঞ্চলের কর্মসূচির কথা স্মরণ করিয়ে এম এ মান্নান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, হাওরে আর কোনো রাস্তাঘাট নয়। এর মধ্যেই আমরা সুনামগঞ্জের সঙ্গে নেত্রকোণার সংযোগের জন্য উড়াল সড়ক করছি, যাতে হাওর ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। জেনেশুনে এমন প্রকল্প হাতে নেব নাÑ যাতে আমাদের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমাদের খাগড়াছড়িসহ পাহাড়গুলোতে বিশেষ মনোযোগ প্রয়োজন। 

তার মতে, সবুজ উন্নয়নে বাংলাদেশ কিছু চিত্তাকর্ষক অগ্রগতি করেছে। উদাহরণস্বরূপ, সবুজ কারখানার সংখ্যায় আমাদের গার্মেন্টস সেক্টর বিশ্বের সেরাদের মধ্যে রয়েছে। 

একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলার অংশ হিসেবে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে আগামী ৩০ বছরের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর সরকারি পরিকল্পনার কথা জানিয়ে এ খাতে এডিবি বিশ্বব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন বাড়ানোর আহ্বান জানান পরিকল্পনামন্ত্রী।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের কান্ট্রি ডিরেক্টর আব্দুলায়ে সেক বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।" তিনি আরও বলেন, “প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা এবং প্রবণতা বৃদ্ধির সাথে সাথে বাংলাদেশকে অবশ্যই পরিবেশ ও জলবায়ু সংক্রান্ত ঝুঁকি মোকাবেলায় আরো বেশি সক্রিয় হতে হবে। একইসাথে দেশের চলমান শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে আরও অনেক পদক্ষেপ নিতে হবে। সবুজ প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশকে জলবায়ু ঝুঁকির বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তুলতে এবং উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করতে পারে।”

বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জোরালো পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের প্রবৃদ্ধিনির্ভর নীতি হাতে নিতে হবে। এদেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। বড় সুবিধা আদায়ের জন্য ডিজিটাল অবকাঠামো নির্মাণের পথে হাঁটতে হবে। এতে পরিবেশ রক্ষার আইডিয়া থাকা দরকার।’

তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে বাংলাদেশকে অবশ্যই পরিবেশ ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আরও অনেক কিছু করতে হবে। সবুজ প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশকে জলবায়ু ঝুঁকির বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কেবল ঘূর্ণিঝড়ের কারণেই বছরে বাংলাদেশের আর্থিক ক্ষতি প্রায় ১০০ কোটি ডলার। আর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে ঘরছাড়া হতে পারে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ।

জ্বালানী শক্তির এই রূপান্তর দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমবাজারকে নতুন রূপ দিতে পারে। এই অঞ্চলের প্রায় এক-দশমাংশ শ্রমিক দূষণের আশংকাযুক্ত কাজে নিযুক্ত। এই কাজগুলি স্বল্পদক্ষ এবং প্রান্তিক শ্রমিকরা করে থাকে। তারা সাধারণত পেটের দায়ে এ ধরণের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে যায়। যদিও শক্তির রূপান্তর এ ধরনের প্রান্তিক মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে, এই রূপান্তরের ফলে অনেকে ঐসব ক্ষয়িষ্ণু শিল্পে আটকে থাকতে পারে ও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারে। প্রতিবেদনে তাদের সুরক্ষার জন্য বিস্তৃত নীতির সুপারিশ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে উচ্চ-মানের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও বাজার সুবিধা; কর্মীদের গতিশীলতা সহজতর করা; এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।

বিআইজিডি নির্বাহী পরিচালক ইমরান মতিন বলেন, “এই সম্মেলনে আমরা সবুজ-বৃদ্ধির এজেন্ডার উপর জোর দিয়েছি এবং কি ধরনের পরিকল্পনা ও নীতি গ্রহণ করে আমরা এই এজেন্ডাটি এগিয়ে নিতে পারি সে সম্পর্কে গভীর অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেছি" । তিনি আরও বলেন, “দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের বিপুল জনসংখ্যা এবং জনসংখ্যার বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করলে সবুজ-বৃদ্ধির এজেন্ডা শুধুমাত্র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। বরং এই এজেন্ডাকে কেন্দ্র করে উদ্ভাবন উৎসাহিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং আমরা সেদিকেই এগিয়ে যেতে চাচ্ছি । তবে সবুজ-বৃদ্ধি এজেন্ডা কখনোই বাস্তবয়ন হবে না যদি না তা একই সাথে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারে। তাই এই বিষয়টি বুঝতে আমাদের ভৌত ও সমাজবিজ্ঞানের সম্মিলিত জ্ঞানের ব্যবহার করতে হবে, যেমন প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান। তবেই অন্তর্ভুক্তিমূলক সবুজ সমৃদ্ধি সম্ভব হবে।”